দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বুধবার স্বাক্ষরিত ১৪ দফার সমঝোতা স্মারকে লেবাননের সংঘাত, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। তবে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি এখনো প্রকাশ না হওয়ায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা বুধবার সাংবাদিকদের কাছে সমঝোতা স্মারকের পাঠ তুলে ধরেন। তবে ইরানি কর্মকর্তারা এখনো যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থাপিত সংস্করণ নিশ্চিত করেননি।
সমঝোতার প্রথম ধারায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ‘লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধে’ সম্মত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে উভয় দেশ লেবাননের ‘আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব’ রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
তবে এতে ইসরায়েলের কোনো উল্লেখ নেই। বর্তমানে ইসরায়েল লেবাননের এক-পঞ্চমাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে এবং মার্চের শুরু থেকে প্রায় প্রতিদিন হামলা চালিয়ে আসছে। এসব হামলায় অন্তত তিন হাজার মানুষ নিহত এবং ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
সমঝোতায় ইসরায়েল বা লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ কোনো পক্ষ হিসেবে নেই। ফলে লেবাননে যুদ্ধবিরতি কীভাবে কার্যকর হবে বা ইরানকে হিজবুল্লাহকে অর্থায়ন বন্ধ করতে হবে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি। অঞ্চলজুড়ে ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থনের বিষয়টিও চুক্তিতে উল্লেখ নেই।
এদিকে ইসরায়েলি নেতৃত্ব বারবার জানিয়েছে, তারা লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে না। সোমবার দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ এক বিবৃতিতে বলেন, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে সমন্বয় করে এমন নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে, যার আওতায় লেবানন, সিরিয়া ও গাজার নিরাপত্তা অঞ্চলে সেনাবাহিনী অনির্দিষ্টকাল অবস্থান করবে।
সমঝোতার দ্বিতীয় ধারায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো এবং পরস্পরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার অঙ্গীকার করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে ইরানে সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্য থেকে ওয়াশিংটন সরে এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে দাবি করেছেন যে তিনি কখনোই সরকার পরিবর্তনকে লক্ষ্য হিসেবে দেখেননি। তবে ফেব্রুয়ারিতে তেহরানে হামলার শুরুতে তিনি ইরানের জনগণকে উদ্দেশ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকার নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
সমঝোতার চতুর্থ ধারায় যুক্তরাষ্ট্র ৩০ দিনের মধ্যে নৌ অবরোধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই সময়সীমার মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার পর নিজস্ব বাহিনীও সরিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
পঞ্চম ধারায় ইরান পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর এবং বিপরীতমুখী বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ৬০ দিনের জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালানোর কথা জানিয়েছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ প্রশাসন ও সামুদ্রিক সেবা নির্ধারণে ওমানের সঙ্গে সংলাপ করবে।
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ শান্তি আলোচনার অন্যতম বড় বিরোধের বিষয় ছিল। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর ইরান প্রণালিটি জাহাজ চলাচলের জন্য বন্ধ করে দেয়। এর জবাবে এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ শুরু করে।
সংঘাত চলাকালে কিছু দেশের জাহাজকে সীমিতভাবে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সঙ্গে আলাদা সমঝোতা করতে হয়েছে। কিছু জাহাজকে দুই মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ফি দিতে হয়েছে বলেও জানা গেছে। ফলে বীমা ব্যয় বেড়ে যায় এবং অনেক জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ঝুঁকি নিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ে।
চুক্তির অষ্টম ধারায় ইরান পুনর্ব্যক্ত করেছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জন করবে না। একই সঙ্গে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে উভয় দেশ পারস্পরিকভাবে সম্মত একটি ব্যবস্থার আওতায় সমাধানে পৌঁছাবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সর্বনিম্ন পদ্ধতি হিসেবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার তত্ত্বাবধানে দেশেই ইউরেনিয়ামের সমৃদ্ধতার মাত্রা কমিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে।
ইরানের কাছে বর্তমানে প্রায় ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এটি অস্ত্রমানের ৯০ শতাংশের নিচে হলেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় ৩ থেকে ৫ শতাংশের তুলনায় অনেক বেশি।
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইরানকে এ মজুত হস্তান্তরের আহ্বান জানিয়ে এলেও তেহরান তা প্রত্যাখ্যান করে আসছে। তবে সমঝোতার ভাষা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে মজুত বিদেশে পাঠানোর পরিবর্তে সমৃদ্ধতার মাত্রা কমিয়ে আনার পথ গ্রহণ করা হতে পারে।
পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রসঙ্গে সমঝোতার ষষ্ঠ ধারায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে মিলে অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করবে। এ অর্থ ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যবহৃত হবে। প্রয়োজনীয় আর্থিক লেনদেনের জন্য সব ধরনের অনুমোদন ও ছাড়পত্র দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে ওয়াশিংটন।
তবে এই অর্থ কে দেবে, কীভাবে ব্যয় হবে কিংবা কোনো শর্ত থাকবে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ নেই। ট্রাম্প এর আগে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে উপসাগরীয় দেশগুলোকে এতে অবদান রাখতে বলা হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের করদাতারা এই ব্যয় বহন করবেন না।
সমঝোতার সপ্তম ধারায় ইরানের ওপর আরোপিত সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী প্রত্যাহারের অঙ্গীকার করা হয়েছে। তবে এটি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, নাকি জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞাও এর আওতায় পড়বে, তা স্পষ্ট করা হয়নি।
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা দেশগুলোর একটি ইরান। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির আওতায় কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলেও ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন সেই চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার পর আবারও কঠোর ব্যবস্থা কার্যকর হয়। এর ফলে বিদেশি ব্যাংকগুলোতে ইরানের বিপুল পরিমাণ সম্পদ এখনো জব্দ অবস্থায় রয়েছে।
যদিও ১৪ দফার এই সমঝোতা লেবানন, হরমুজ প্রণালি, পারমাণবিক কর্মসূচি ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের বিষয়ে নতুন কাঠামো উপস্থাপন করেছে, তবুও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ভূমিকা এবং চূড়ান্ত চুক্তির বিস্তারিত শর্ত নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
/অ